রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ভয়

সোহেল নওরোজ

সাঁঝসকালে দরজা খুলেই ফারুক মামাকে দেখে যথেষ্ট বিরক্ত হলো নাইমা। সময়-অসময় নেই কোত্থেকে যে তিনি উদয় হন আল্লাহমালুম! পানের ব্যবসায় নামার পর এ বাড়িতে মামার যাতায়াত উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। হাটের দিন খুব ভোরে ট্রাকে পান তুলে দিয়ে সোজা এখানে এসে হাজির হন। ‘কেমন আছিস রে, কাঁচকি?’ চোয়াল ভাঙা গাল বাঁকা করে বিশ্রী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন। রাগে নাইমার গা জ্বালা করে উঠলো। বহুবার বারণ করা সত্ত্বেও মামা তাকে ‘কাঁচকি’ বলে ডাকে। মার মুখে শোনা, তার জন্মের দিন বাড়িতে কাঁচকি মাছ রান্না হয়েছিল। তাছাড়া মামার ভাষ্য, সে নাকি ছোটবেলায় কানের কাছে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে তাকে অতিষ্ট করে তুলতো। তখন থেকে এ জঘন্য নামটি মামার মুখে মোটামুটি স্থায়ী হয়ে গেছে। নিতান্ত অনিচ্ছায় ‘ভালো’ বলে দরজা ছেড়ে নিজের ঘরে ঢুকলো নাইমা। রুটিন মাফিক মামা এখন সোফায় হেলান দিয়ে কিছুণ ঝিঁমুবে। তারপর মুখ হাঁ করে ঘুমিয়ে যাবে। বাবা মর্নিংওয়াক থেকে ফিরে ডাকাডাকি না করা পর্যন্ত উঠবে না।
জেএসসি পরীা সন্নিকটে। নাইমা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে আজ জ্যামিতি অংশ শেষ করেই ছাড়বে। মা রান্নাঘরে নাশতা তৈরিতে ব্যস্ত। এ সুযোগে মামাকে একটু হেনস্তা করলে মন্দ হয় না। মামা বেশ সাহসী। অন্তত চলনে বলনে তাই মনে হয়। কিš' আরশোলা ভীতি প্রচন্ড। নোংরা এবং কুৎসিত এই অষ্টাপদী পতঙ্গ স"ষ্টির পেছনে তিনি নাকি কোনো কারণ খুঁজে পান না! তেলাপোকা দেখামাত্র গা গুলিয়ে যায়। ভয়ে অ¯ি'র হয়ে বিকট চিৎকার দিয়ে উঠেন। মানুষের অনেক রকম ভীতির কথা সে বইতে পড়েছে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘ফোবিয়া’। তেলাপোকার ভয়কে তেমনি ‘ক্যাটসারিওফোবিয়া’ বলে। ফারুক মামার ক্যাটসারিওফোবিয়া যে অতি উচ্চমাত্রার, সে বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। ভাগ্যিস নাইমার এ ধরণের কোনো ফোবিয়া নেই! থাকলে হয়তো তার আরেকটা নোংরা নাম জুটে যেত!
গতকালই স্টোররুমে আরশোলা মারার বিষ ছিটানো হয়েছে। সন্তর্পণে স্টোররুমে ঢুকে মেঝেতে পড়ে থাকা বেশ কয়েকটা আরশোলা পলিব্যাগে ভরে নিঃশবব্দে মামার মাথার কাছে রেখে এল। তিনি জাগার পর নিশ্চয় এলাহি কান্ড ঘটবে। মামাকে শায়েস্তা করার উত্তেজনায় তার শরীর কেঁপে উঠলো। পড়ার টেবিলে বসে নাইমা সে মহেন্দ্রণের অপো করতে লাগল। খানিকবাদে বাবার গলার আওয়াজ শোনা গেল। কিন্তু মামার কোনো উচ্চবাচ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কি ভয়ে জ্ঞান হারালেন! এখন কী হবে? অকস্মাৎ নাইমার দুশ্চিন্তায় জল ঢেলে আরশোলাসমেত পলিব্যাগ হাতে মামা ঢুকলেন। ‘ভয়-ই যখন দেখাবি তখন একটু কষ্ট করে জ্যান্ত তেলাপোকা জোগাড় করতিস। এগুলো তো মরে সিটকায়ে আছে। মরা তেলাপোকা দেখে আমাকে ভয় পেতে দেখেছিস? এমনি কি আর তোকে ‘কাঁচকি’ নামে ডাকি!’
মামার কথা শুনে আর নিজের অপরিণত বুদ্ধির কথা ভেবে নাইমার তো আক্কেলগুড়ুম! মামা কি তবে আরশোলা দেখে ভয়ের ভান করেন? সত্যিই তো, তার মতো ছোট মেয়ে তেলাপোকা দেখে ভয় না পেলে, প্রায় মাঝবয়সী ফারুক মামার সে ভীতি থাকবে কেন?
তবু কিছু মানুষের তো ঠিকই ক্যাটসারিওফোবিয়া থাকে। মানুষের চরিত্র কত বিচিত্রই না হতে পারে, ভেবে কূল পায় না নাইমা।

বাবার পায়ের আওয়াজ

সুহৃদ আকবর

আমার প্রিয় ঋতু শীত। গ্রীষ্মকাল আমার একেবারেই অসহ্য লাগে। বর্ষা ভাল লাগে বেশ। কারণ তখন গাছের ডালে কোকিল ডাকে। বসন্ত কার না ভাল লাগে। সে সময় বাগানে ফুল ফোটে। শরৎকে ভাল লাগে নদীর ধারে কাশফুল ফোটে বলে। হেমন্তে নবান্ন উৎসব হয়। তখন পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধে চারিদিক আমোদিত থাকে। মায়ের হাতের পিঠার কথাতো না বললেই নয়।
তখন অমাদের চালাঘর ছিল। প্রতি বছর শীত এলে আমার কৃষক বাবা খড়ের সেই পুরনো চাল ফেলে দিয়ে সেখানে নতুন খড়ের ছাউনি দিতেন। কখনো একা একা কাজ করতেন আবার কখনোবা ইসমাঈল কাকাকে বেগার নিতেন। ইসমাঈল কাকা আগে সৌদি আরব থাকতেন। ওমরা করতে গিয়ে দুই বছর থেকে গেছেন। আমাদের এখানে কাজ করতে এলে তিনি সৌদি আরবের গল্প করতেন। তিনি সে দেশে একটা বিড়াল পুষতেন, সেটার গল্প। আমি মনোযোগ সহকারে তার গল্প শুনতাম। গল্প শুনে আনমনা হয়ে যেতাম।
খড়ের নতুন ছাউনি দেয়ার সময় আমাদেরকে একরাত খড়বিহীন চালের নিচে থাকতে হত। মনে পড়ে, আমরা ভাই-বোনেরা মিলে একসাথে কাঁথা মুড়িয়ে ঘরের ভেতর ঘুমাতে যেতাম। সাথে চলত কাঁথা টানাটানি। তখন চাঁদের শরীর থেকে ঝরে পড়ত রজনীগন্ধার মত সাদা মিষ্টি আলো। এমনি সময় কনকনে শীতের রাতে কখনোবা মধ্যরাতে বাবা হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে বাজার থেকে ফিরতেন। দূর থেকে হারিকেনের সেই আলোকে মনে হত বড় কোন জোনাক পোকা বুঝি জ্বলছে। হারিকেনটি জোনাকীর মতো মিটিমিটি আলো ছড়াতো চারপাশে। আলোয় বাবার পরণের লুঙ্গি দেখা যেত। মা বেড়ার ফুটো দিয়ে তাকিয়ে বাবাকে দেখতেন। বাবা যখন বাড়ির দরজায় আসতেন তখন ঘরের ভেতর আসা পর্যন্ত গলা খাকারি দিতেন। পা ঝেড়ে আওয়াজ দিতেন। প্রায় সময় দশটা কি এগারটার সময় বাবা  বাজার থেকে আসতেন। তখন আমরা গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকতাম। শুধু আমার মা কুপি জ্বালিয়ে একা একা জেগে থাকতেন স্বামীর প্রতীায়।
অনেক ছোট বয়সে মায়ের বিয়ে হয়। বিকালে বাবা মরিচ-বেগুনের চারা নিয়ে বাজারে যেতেন। বিক্রি করে চাল-ডাল আনতেন। মা রান্না করতেন। বাবা আমাদেরকে ডেকে তুলে ভাত খাওয়াতেন। আমরা সবাই উঠতাম। গরম গরম ভাত খেতাম। পেটের উপর দিয়ে ধোঁয়া উঠত। কিন্তু সেজো ভাই জয়নাল (এখন সৌদি আরব থাকেন) কিছুতেই উঠতনা। পরদিন সকালে বলত, - ‘আঁরে ভাত খাইবালায় ডাকেননাই কিলায়?’
-‘তোরে কতবার ডাইকছি তার কো খবর নাই’-মা বলতেন।
আসলে ডাকলেও তিনি উঠতেন না। উঠলেও ঘুম লাগা চোখ কচলিয়ে কেঁদে কেটে আবার ঘুমিয়ে পড়তেন।
এভাবে শীতের সাথে আমার কৈশোরের সোনাঝরা স্মৃতি জড়িয়ে আছে গায়ে দেয়া চাদরের মত। যেভাবে প্রিয়া চাঁদগলা জোৎস্না রাতে তার প্রিয়কে জড়িয়ে ধরে ঠিক সেভাবে। সকালে বাবা খেজুর গাছ থেকে রস নামাতেন। মা পিন্নী রাঁধতেন। কখনো ভাঁপা পিঠা বানাতেন। আমরা সবাই খেতাম। ফজরের আযান দিলে বাবা গরম কাঁথা ছেড়ে উঠে মসজিদে যেতেন। আমাকে ডাকতেন। আমি কখনো উঠতাম, কখনো শীত বেশি পড়লে উঠতাম না। না উঠলে বাবা তাঁর লাঠি দিয়ে আমার গায়ে মৃদু আঘাত করতেন। আমার তেমন ব্যথা লাগত না। কারণ, আমি কাঁথা মুড়িয়ে থাকতাম। বাবা মসজিদ থেকে এসে সূর্য উঠা পর্যন্ত কোরআন তেলাওয়াত করতেন। বাবার কোরআন তেলাওয়াতের সুর আমার কানে এসে লাগত। প্রকৃতির চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ত সে সুরের লহরি। গাছের সবুজ পাতা আনন্দে নেচে উঠত। আমি তখনো কোরআন পড়তে শিখিনি। তখন শুয়ে শুয়ে আনমনা হয়ে বাবার কোরআন তেলাওয়াত শুনতাম। পরে বাবার কাছ থেকেই কোরআন পড়া শিখেছি। বাবা কোরআন তেলাওয়াত শেষ করে লাঙল-জোয়ান কাঁধে করে গরুর রশি ধরে দক্ষিণের মাঠের দিকে যেতেন। তখন কিশোরী মেয়ের নাকফুলের মত শিশির জমে থাকতো ঘাসের ডগার উপর। সূর্য থেকে ঠিকরে পড়ত আলোর দ্যূতি। এভাবে শীতের সাথে আমি এবং আমার বাবার জীবনের প্রতিচ্ছবি একাকার হয়ে মিশে আছে।
প্রতি বছর শীত আসে শীত যায়। কিন্তু বাবা আর আসে না। তাই আমি এখন চেয়ে থাকি সময়ের দিকে। সময় আমাকে কোন জবাবই দেয়না। সময়ও এখন অনেক পাল্টে গেছে। সে বড় নিষ্ঠুর। সে বড় স্বার্থপর। সে সবকিছু ভুলে যায়। সবকিছুকে সে ভুলিয়ে দেয়। এখন না আছে আমাদের চালা ঘর, না চাঁদের আলো, না বাবার গলার কণ্ঠ, না তাঁর পায়ের আওয়াজ। সবকিছু এখন কেবলই স্মৃতি। তাই এখনো মধ্যরাতে শুনতে পাই বাবার পদধ্বনি।
আমার লক্ষ্মী বাবা, সরল বাবা, ভালো বাবা তুমি ভালো থেকো সুখে থেকো অনেক অনেক ভালো; অমরাবতীর সবুজ কাননে। আরা তোমার এই দুষ্টু ছেলের জন্য বদদোয়া করোনা; দোয়া করো, যেন তোমার খোদাভীরুতা আর সরলতার পবিত্র গুণে বিভূসিত করে নিজের জীবনকে সাজাতে পারি।

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

চাঁদের হাসি

মুহাম্মাদ হাবীবুলাহ হাস্সান

চাঁদ মুচকি হেসে সালাম দিল সীমাকে। তাকে স্বাগত জানাল। সীমা আববুর পাশে বসে পাঠ মশ্কে করছিল। সে চাঁদের মুচকি হাসির দিকে খেয়ালই করে নি। চাঁদের কাছে ব্যাপারটা খুব আশ্চর্য মনে হলো। চাঁদ বিস্ময়ে ভাবছে, কত আদুরে হাসি সীমাকে আমি উপহার দিলাম, অথচ সে আমার হাসি ও সালামকে পাত্তাই দিল না। হাজার হাজার বছর ধরে আমি আলোকোজ্জ্বল আকাশে উদিত হয়ে আসছি। কতো পিচ্চি সোনামণিদের আমি মুগ্ধ করেছি। মুগ্ধ করেছি সীমার চেয়ে আরো অনেক পাকা বুড়ো-বুড়িদের, কবি-সাহিত্যিকদের। কিন্তু সীমার মতো লা-পরোয়া মেয়ে তো আর দেখি নি। চাঁদ আপন মনে এসব কথা ভাবছে। ঠিক সে মুহূর্তে হঠাৎ তার পিতা বলল - -বাহ, কত সুন্দর চাঁদ। কী হলো সীমা তোর । চাঁদ নিজের সবটুকু সৌন্দর্য নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়, আলিঙ্গন করতে চায়। আড্ডা দিতে চায় হৃদয়-মন ভরে।  দেখ দেখ, তার সালামের উত্তর দাও। উত্তর না দিলে প্রিয় চাঁদ তোর সঙ্গে রাগ করবে মা। সীমা হেসে বলল : নিঃসন্দেহে চাঁদ খুবই সুন্দর! কিন্তু চাঁদ দিয়ে আমার লাভ কি আব্বু?’ পিতা আশ্চর্য করে বলল : কী বলিস সীমা ? চাঁদ হলো সৌন্দর্য ও আনন্দের প্রতীক। দেখতে পাস না, পুরো আকাশ কিভাবে আলোয় ঝলমল করছে! চাঁদের চতুর্দিকে তারকারা কিভাবে হেসে-হেসে নৃত্য করছে! চাঁদ সম্পর্কে এমন কথা কেউ বলে মা? সীমা বলল, কিšন্তু বিদ্যুৎ থাকতে চাঁদের কী প্রয়োজন, আব্বু ? এখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগ। এখন এটাই বাস্তবতা। এ বাস্তবতা কিছুতেই পরিবর্তনীয় নয়। তুমি তো ভীষণ জ্ঞান-বুড়ো আব্বু। তোমাকে এসব কথা নতুন করে বলতে হবে? তুমি তো সব বোঝ আব্বু। পিতা প্রিয় সীমাকে চাঁদের উপকারিতা সম্পর্কে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। ঠিক সে মুহূর্তে, পিতা মুখ খোলার আগেই, হঠাৎ টুপ করে মুখ লুকাল চাঁদটা। নিভে গেল তার আলো। আঁধারিতে ছেয়ে গেল পুরো আকাশ। তারকাদের মন ডুবে গেল বিষণ্ণতার কালিমায়। সীমা কেঁপে ওঠল ভয়ে। আশ্রয় নিল পিতার কোলে। কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বলল, কী হলো, আববু, কী হলো? সবকিছু ছেয়ে গেল আঁধারিতে। ভয়ে আমার তনুমন কাঁপছে। কিছুক্ষণ আগেই তো সবকিছু ঝলমলে উজ্জ্বল ছিল। মেয়ের পিঠে আদুরে-শীতল হাত রেখে পিতা বলল, এখন বুঝছিস সীমা চাঁদের মূল্য? সীমা বলল, বুঝেছি আববু, ভালো করেই বুঝেছি। আমাকে মা কর চাঁদমণি! তুমি ফিরে এস। ফিরে এস আমার প্রিয় চাঁদ। আমি সত্যি ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা কর। তুমি ছাড়া আমার রাত চলবে না। তুমি আমার বড় বান্ধবি চাঁদমণি। আর তোমাকে অবহেলা করব না, ওয়াদা দিলাম। ফিরে এস তুমি, জলদি ফিরে এস। পিতা বলল, মনে হয়, চাঁদ তোর উদাসীনতায় খুব কষ্ট পেয়েছে। আজকের বিকালে, মনে হয়, ও আর ফিরে আসবে না। সীমা বলল, কিন্তু আববু, চাঁদ তো শিশুদের খুব ভালোবাসে। আমি ভুল স্বীকার করেছি। হে প্রিয় চাঁদ! তুমি আমার কথা শুনবে না। ফিরে আসবে না তুমি। চাঁদ সীমার করুণ কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারল, সীমার মন দুঃখে খুব ভারি হয়ে গেছে। চাঁদ ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসল। আলোকিত হলো আকাশ। তারকারা হেসে ওঠল সুমধুর গান গেয়ে।
সীমা বলল, কত ভালো চাঁদ তুমি। কত প্রিয় আমার চাঁদ! ধন্যবাদ তোমাকে।
চাঁদ হেসে বলল, শুনো হে সীমা। তুই পবিত্র শিশু। একেবারে ফুলের মতো। ভোরের স্নিগ্ধ আলোর মতো। নতুন চাঁদের হাসির মতো। মনে রেখ, ¯্রষ্টার কোনো সৃষ্টি অর্থহীন নয়। আমি তার এক উজ্জ্বল সৃষ্টি। আমি তোর মতো শিশুদের খুব স্নেহ করি। তাদের খেলার মাঠ আলোকিত করি। তুই আমার চিরবন্ধু। তোকে ক্ষমা করে দিলাম। আমরা চিরদিন বন্ধু হয়ে থাকব- প্রতিশ্রুতি দিলাম। সীমা খুশীমনে ফিরে গেল পড়ার টেবিলে। তখনো তার মনে ফোটে আছে শুধু চাঁদের হাসি, চাঁদের হাসি।

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

জিলাপী

মুহাম্মদ আরকানুল ইসলাম

যেন কোনদিন খায়নি, দেখেনি-ঠিক এরকম অবস্থা। কার আগে কে নেবে- এ এক হুলস্থূল অবস্থা। অবশ্য খায়নি যে এটাও ঠিক। এই সাইজের জিলাপী খুব কমই খাওয়া হয়েছে এদের। সচরাচর দোকানে যে জিলাপী পাওয়া যায় এই জিলাপী সাইজ ও স্বাদে তার চেয়ে আলাদা। এই গ্রামে সে রকম জিলাপী কেউ বানায় ও না।
খালিদ সাহেব বছরের মাঝে-মধ্যে গ্রামে এসে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন। দোয়া শেষে তাবাররুকের ব্যবস্থা করেন।
এবারও তাই করলেন। তবে তাবাররুকের আয়োজন যেন অন্যবাবের চেয়ে একটু ভিন্ন। এবারের তাবাররুকের প্যাকেটের বিশেষ একটা আইটেম শাহী জিলাপী। স্বাদে অসাধারণ।
বেশ কিছুদিন ধরে খালিদ সাহেবের ব্যবসা মন্দ যাচ্ছিল, শুধু খালিদ সাহেব না: কারো ব্যবসা ভালো যাচ্ছিল না। অনেকটা হঠাৎ করে খালিদ সাহেবের ব্যবসায় লাভের ফুল ফুটলো। তাই তিনি গ্রামে এসে মিলাদ মাহফিল করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
মসজিদ জুড়ে যে চেঁচামেচি হচ্ছে তাতে কারো বোঝার উপায় নেই, এটা কি মসজিদ নাকি মাছের বাজার। কারো চোখ বেঁধে যদি এখানে নিয়ে আসা হয় সে নিশ্চিত ধরে নেবে এটা মাছের বাজার। এখন তো তাবাররুকের জন্য এই চেঁচামেচি; সপ্তাহের জুমাবারেও এই ধরণের চেঁচামেচি হয়। একদিকে ইমাম সাহেব জুমার খুতবা পাঠরত। অপরদিকে উঠতি বয়সী ছেলেদের গালগল্প! যেন গল্পের জন্য এটাই শ্রেষ্ঠ সময় শ্রেষ্ঠ স্থান!
কিছুদিন আগেও জুমার খুতবা শুনতে এসে একে অপরকে জিজ্ঞেস করত- এ্যাই আজকের বাংলা সিনেমার নাম যেন কী? আর এখন তো দেশ অনেক এগিয়েছে! বাংলা সিনেমার প্রতি কমে গেছে ঝোঁক। খুতবা শুনতে এসে ব্লু-টুথের মাধ্যমে পরস্পরে ডাটা ট্রান্সফার করে!
দোয়া শেষে তাবাররুক বিতরণ চলছে। খালিদ সাহেব একটা ব্যাপার বেশ কিছুণ ধরে পর্যবেণ করছেন। তাবারুকের প্যাকেট নেয়ার জন্য অন্যদের মত একটা ছোট ছেলেও একবার এদিকে যায়, আরেকবার ওদিকে যায়। কিন্তু কিছুতেই নিতে পারছে না। ছেলেটার চেহারার সাথে খুবই আপনজন কারো চেহারার যেন মিল আছে। ঠিক মনে করতে পারছেন না খালিদ সাহেব।
ভিড় আর ঠেলাঠেলির কারণে নিতে গিয়ে ও বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। অবশেষে একটা প্যাকেট পেল। প্যাকেট হাতে নেয়ার পরপরই খুলে তা থেকে জিলাপী বের করে মুখে দিল। মুখে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার সাথে যেন ধাক্কা লেগে জিলাপীটা পড়ে গেল। পড়ল তো পড়ল একেবারে মসজিদ নির্মাণের জন্য আনা বালির ওপর।
এটা দেখে খালিদ সাহেব যেন পুরনো স্মৃতিতে ডুব দিলেন। জিলাপীর জন্য কত কিনা করেছেন, এখন ভাবতেই লজ্জা লাগছে। লজ্জার ভাবটাও তার চেহারায় পুরোপুরি এসে গেছে।
তখন বয়স আট কি নয়। একবার বড়ভাইয়ের সাথে চায়ের দোকানে গিয়েছিলেন। বড় ভাইয়ের বেশ ক’জন বন্ধুসহ ছিল। বন্ধুরাসহ বড়ভাই আড্ডা দেয়ার পর চা-দোকানে গেল। সেখানে অন্য নাস্তার সাথে জিলাপীও ছিল। সবাই খাচ্ছিল যে যার মত করে। খালিদ সাহেবও অন্যদের মত খা"িছল। একটা খাওয়ার পর আরেকটা হাতে নিল। সেটা শেষ করে আরেকটা নিতে যাবে এমন সময় বড় ভাই খালিদ সাহেবের গায়ে চিমটি কাটলেন।
খালিদ সাহেব ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। তিনি জিলাপীটা আবার নিতে যাবেন এমন সময় বড় ভাই হাতের কনুই দিয়ে হালকা ধাক্কা দিলেন। এরপর যা বোঝার বুঝে নিলেন। ঐ দিন জিলাপীটা খাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বড় ভাইয়ের বাঁধায় পারেননি।
আরেকবারের ঘটনা। পাশের মাদ্রাসায় এক বড় হুজুরের ঈসালে সাওয়াব মাহফিল চলছিল। সন্ধ্যার পর খালিদ সাহেব তার ভাগ্নেকে নিয়ে মাহফিলে গেলেন। তিনি ভেবেছিলেন মাহফিলে জিলাপী দেওয়া হবে। যা মাহফিলে অবধারিতভাবে দেওয়া হয়। মাহফিল শেষ হতে দেরি দেখে তিনি চলে এলেন।
রাতের খানাপিনা শেষ হওয়ার পর বড় ভাই  বাড়ির সবার সামনে তাকে বললেন- তুমি মাহফিলে গিয়েছিলে না? ভেবেছিলে জিলাপী দেবে, ততণ তো ধৈর্য ধরে বসতে পারনি।
খালিদ সাহেব সেদিন বড় ভাইয়ের কথা শুনে হতবাক হয়েছিলেন। কারণ তিনি তার সঙ্গী ভাগ্নেকেও জিলাপীর কথা একবারের জন্যও বলেননি। বাড়ির কেউ তো দূরের কথা। এসব ভাবতে ভাবতে খালিদ সাহেব ছেলেটির কাছে গেলেন। ছেলেটির চোখ তখনও বালির উপর পড়ে থাকা জিলাপীর ওপর। ছেলেটির কাছে যেতেই বললেন-
: তুমি কার ছেলে?
: ড্রাইভার নুরুর ছেলে।
ড্রাইভার নুরু বলার সাথে সাথে খালিদ সাহেব গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন।
নুরুর স্ত্রী ছিল খালিদ সাহেবের প্রিয় এক মানুষ। তার সাথে ছিল মন দেয়া নেয়ার এক গভীর সম্পর্ক। তিনি ভেবেছিলেন তাকেই জীবন সঙ্গীনি করে নেবেন। মনে-প্রাণে এ ইচ্ছা লালন করে এলেও পরিবারের কারণে সেটা পূরণ হয়নি। বাবা তাদের পরিবারটাকে মোটেও পছন্দ করতেন না। বাবার এক কথা ছিল- ওকে বিয়ে করলে এ ঘরে তোর আর স্থান নেই।
কঠিন এই আদেশ পালন করতে গিয়ে জীবন থেকে হারাতে হয়েছিল ওকে। ওর পরিবারও মেয়েকে বিয়ে দিতে দেরি করেনি। একই গ্রামের নুরুর সাথে ঘটা করে বিয়ে বসায়। যেন খালিদ সাহেবের উপর এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিশোধ।
সে বছর দশেক আগের কথা। খালিদ সাহেব সে সব স্মৃতি অনেকটা ভুলে যেতে বসেছেন সংসার ব্যবসার ব্যস্ততার কারণে। এসব মনে করে নতুন করে জ্বালা নিতে চাইছেন না।
: ছেলেটি কাছে এলে খালিদ সাহেব তাকে বললেন-
: তোমাদের ঘরে কে কে আছে?
: মা-বাবা ও আমরা দুই ভাই।
খালিদ সাহেব ভাবছেন তার মা কেমন আছে জিজ্ঞেস করবেন কি না, কিন্তু বিবেকের কোন এক বাধায় তিনি তা পারলেন না।
: জিলাপী কি তোমার খুবই পছন্দের?
: হ্যাঁ, পছন্দ করি।
আমারও পছন্দের, তোমার মত আমিও জিলাপীর জন্য অনেকটা পাগল ছিলাম- কথাটা এমনভাবে বললেন যেন নিজের ছেলেকে বলছেন। খালিদ সাহেবের কথা শুনে ছেলেটারও তাকে আপনজন মনে হতে লাগল। সে শান্ত ছেলের মত খালিদ সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
খালিদ সাহেব তাকে তাবাররুকের চারটা প্যাকেট হাতে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
নিজের পছন্দের জিনিস অন্যেরও পছন্দের বলে নাকি অন্যকোন টান থেকে ছেলেটাকে চারটা প্যাকেট দিলেন খালিদ সাহেব নিজেও ঠিক বুঝতে পারলেন না।